নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বিশ্ব ঐতিহ্যের লীলাভূমি সুন্দরবন ধ্বংসে নতুন কৌশল হিসেবে শামুক নিধনে মেতে উঠেছে একটি চক্র। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে জনবলের পাশাপাশি মোটা অংকের বিনিয়োগ করছে চক্রটি। বিভিন্ন প্রলোভনে সাধারন জেলেদেরও সম্পৃক্ত করছে।
প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে সুন্দরবনের গহীনে ও সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট খাল গুলোতে রাতভর অবৈধ শামুক ধরার কর্মযজ্ঞ চলে। রাতে ধরা শামুক গুলো উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দিনের আলোয় প্রকাশ্য বেচাকেনা হয়। সারাদিনই খুচরা ক্রয় কৃত শামুক গুলো আড়ৎদার বা মহাজনের কাছে পৌঁছায়। মহাজন সেগুলো সন্ধ্যায় গাড়ি লোড় করে ঢাকা হয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করে।
এই লম্বা প্রক্রিয়াটির সবকিছু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে! প্রশ্ন হল প্রশাসন কি সব সময় চোখ বন্ধ করেই থাকে?
এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশ কয়দিন অনুসন্ধান চালানো হয় বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা ও কৈখালী ইউনিয়নের শামুক আহরণে জড়িত জেলেদের কাছে। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রতি মাসে নির্বিঘ্নে শামুক পাচারের জন্য দুই থেকে আড়াই লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এই ঘুষের টাকা গ্রহনের তালিকায় বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, হেবি ওয়েট রাজনৈতিক নেতা, বনবিভাগের দালালসহ অনেকের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বনবিভাগের এতো তৎপরতা মধ্যে কিভাবে সুন্দরবন থেকে শামুক সংগ্রহ ও নিরাপদে পাচার হচ্ছে এমন প্রশ্ন উত্তরের জন্য কয়েক বার পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি সময়ে কোবাদক, কাঠেশ্বর,বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ বন টহল ফাঁড়ি,কদমতলা ও কৈখালী অফিস এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত শামুক নির্বিচারে শামুক নিধন চলছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিলেও যথানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ আছে।
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, বাউন্ডারিতে আমাদের নজরদারি বাড়িয়েছি। এছাড়া আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। যেকোনো তথ্য পেলেই আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালাচ্ছি এবং জব্দকৃত শামুক ঝিনুক নদীতে অবমুক্ত করছি।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জার ফজলুল হক বলেন,অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নই ওঠেনা। আমাদের ডিপার্টমেন্টে কেউ যদি এ ধরনের অর্থনৈতিকলেনদেনের সাথে জড়িত থাকে তাহলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টা দেখা হবে। এছাড়া শামুক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান অব্যাহত রয়েছে
দীর্ঘদিন পরিবেশ নিয়ে কাজ করা লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, শামুক নদীর তলদেশের মাটি ও পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করে । নদীর প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, দূষণ কমায়, মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এছাড়া মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্যচক্র বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শামুক ও ঝিনুক ব্যাপক নিধন হলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।

উল্লেখ্য,বনবিভাগের অভিযানে গত ২৭ নভেম্বর রাতে উপজেলার মুন্সিগঞ্জের হাজীর মোড় থেকে ৮৬০ কেজি শামুকসহ একটি ইঞ্জিন চালিত ভ্যান জব্দ করে মুন্সিগঞ্জ টহল ফাঁড়ি। পরে অজ্ঞাত কারণে ভ্যানটি ছেড়ে দেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ৬৯০ কেজি শামুক উদ্বার করে সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত করা হয়। উপজেলায় পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী লঞ্চ ঘাট থেকে একটি ট্রলারসহ হাজার কেজি (৭৫ বস্তা) শামুক জব্দ করে বনবিভাগ। এসময় ট্রলার ড্রাইভার কওছার গাজী (৪৮)কে আটক করা হয়। একই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের অধীন মহসিনের হুলা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮ বস্তা (৬০০ কেজি) শামুক উদ্ধার করে। ২রা ফেব্রুয়ারি শ্যামনগর উপজেলার ক্লিনিক মোড় নামক স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৭৫০০কেজি ২১৩বস্তা শামুক ঝিনুক আটক করে বনবিভাগ।
