বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন আবার অশান্ত হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিমের কয়েক বছরের নিরালস পরিশ্রমের ফসল হিসেবে যমুনা টেলিভিশনের মধ্যস্থতায় ২০১৮ সালের ১লা মে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। এসময় ৩২টি দস্য বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য ৪৬২টি অস্ত্র এবং ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদ জমা দিয়ে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সুন্দরবনে ফিরে আসে স্বস্তি। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীরা স্বাচ্ছন্দের সকল কার্যক্রম করে আসছিলেন। তবে ২০২৪সালের ৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে পর শান্ত সুন্দরবনে এক ডজনের বেশি দস্যুদল আবার অশান্ত করে তুলেছে। আগের মত শুরু হয়েছে বনজীবিদের জিম্মি, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়।
প্রতিনিয়ত জেলেদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে দস্যু দলগুলো। সম্প্রতি বনদস্যু জনাব বাহিনীর সদস্যরা মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মৌখালি নদীরধার এলাকার জমাত গাজীর ছেলে মোস্তফা ও একই এলাকার খলিল শেখের ছেলে হুসাইনকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে। মোস্তফার অবস্থার অবনতি হলে তাকে চিকিৎসার জন্য ছেড়ে দিলেও মুক্তিপণের দাবিতে আটকিয়ে রাখা হুসাইনের উপর চালানো হয় নির্মম শারীরিক নির্যাতন। পরবর্তীতে ২লক্ষ ১৪হাজার টাকার বিনিময়ে মুক্তি পায় হুসাইন। মুক্তিপনের টাকা দিয়ে ফিরে আসা হুসাইনের শরীরে বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়। একইভাবে গত ৩০শে মে মালঞ্চ নদীর চালাতেবেড়ে এলাকা থেকে ইয়াছিন খাঁ, আলমগীর খাঁ ও ইসমাইল খাঁ কে ২লক্ষ টাকা চাঁদার দাবিতে জিম্মি করে বনদস্যু নানাভাই বাহিনী। জিম্মির পরপরই নৌকার বৈঠা দিয়ে এলোপাথাড়ি জেলেদের মারতে থাকে দস্যুরা। বৈঠার আঘাতে ইসমাইলের মাথায় মারাত্মক জখম হয়। পরে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইসমাইলের মাথার সার্জারি করে কর্তব্যরত চিকিৎসক।
দস্যদের দাবি কৃত চাঁদার মধ্যে এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা পরিশোধ করে বার দিন পর মুক্তি পায় ইয়াসিন ও আলমগীর।এমন অসংখ্য ঘটনার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চাঁদার দাবিতে জিম্মি হচ্ছে হাজার হাজার নিরীহ বনজীবীরা। সুন্দরবনের দসুতার সাথে যুক্ত বাহিনীগুলো সাতক্ষীরা রেঞ্জকে নিরাপদ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে এখানে সহজে প্রবেশ করা যায়। সাতক্ষীরা রেঞ্জের মালঞ্চ নদী ভারতের একেবারে সীমান্ত এলাকা হাওয়ায় দস্যতায় ব্যবহৃত অস্ত্রের আদান-প্রদান ও দস্যুদের উপরে ওঠা-নামায় এই এলাকাটি নিরাপদ।যার ফলশ্রুতিতে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, কৈখালী ও রমজাননগরের বনজীবীরা দস্যদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে।সুন্দরবনের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিনিয়ত বন বিভাগ, কোস্টগার্ড নৌ পুলিশ ও রিভার বিজিবি`র তাদের দহল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো শুধুমাত্র কোস্টগার্ড ছাড়া তেমন কোন সফলতা কেউ দেখাতে পারছে না। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে অপারেশন ম্যানগ্রোভ শীল্ড পরিচালিত হচ্ছে। যার কারণে বনদস্যরা কোণঠাসা হতে শুরু করেছে। গত ১৬ মাসে বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ডের যৌথ অভিযানে ৬১ জন সক্রিয় দস্যু গ্রেপ্তার, ৮০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
তবে আশার কথা হলো গত ২১শে মে স্টার নিউজের মধ্যস্থতায় ও কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের সহায়তায় ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদারসহ ৭ জন বনদস্যু মোংলার কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরে অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। এই আত্মসমর্পণকে ইতিবাচকভাবে দেখছে সুন্দরবনের সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা জুন, জুলাই ও আগস্ট তিন মাস সরকারিভাবে সুন্দরবন বন্ধ থাকে। এই বন্ধের মধ্যে সুন্দরবনে অবস্থানরত সকল বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের আওতায় নিয়ে আসা হোক। তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবন আবার দস্যু মুক্ত হোক। সুন্দরবনে ফিরে আসুক শান্তি, জেলেদের অবাধ বিচরণে মুখোরিত হোক সুন্দরবন। এমনটাই প্রত্যাশায় সুন্দরবন উপকূলের হাজারো মানুষ।